জাতীয় ডেস্ক | মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | 5 বার পঠিত

পণ্য পরিবহনেও পড়েছে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। সংকটকে পুঁজি করে বেড়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের ভাড়া। পরিবহন সংকটে সবজির মতো পচনশীল পণ্য কম দামে বিক্রি করে লোকসান গুনছেন কৃষক। তবে ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে নিজেদের উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছেন।
সংকট সামলাতে সরকার তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করেছে। এতে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছে না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হাসানুল কবির বলেন, পণ্য পরিবহনে জ্বালানি সংকট শনিবার পর্যন্ত তেমন অনুভূত হয়নি। তবে রোববার নওগাঁ, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গাড়িগুলো তেল কিনতে পারছে, তবে পরিমাণে কম। সরকার রেশনিং করে ট্রাক-কাভার্ডভ্যানে ২২০ লিটার কেনার সীমা বেঁধে দিলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাম্পগুলো গাড়িপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ লিটারের বেশি তেল বিক্রি করছে না। হাসানুল কবির রপ্তানি ও ঈদ সামনে রেখে পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বগুড়া ব্যুরো জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে। এতে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শহরের দত্তবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জামিলুর রহমান জানান, এক সপ্তাহ আগে যে রড টনপ্রতি ৯৪ হাজার টাকায় কিনেছিলেন, রোববার সেটি কিনতে হয়েছে ৯৯ হাজার টাকায়। একইভাবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্টের দামও বস্তাপ্রতি অন্তত ৩০ টাকা বেড়েছে। বড়গোলা এলাকার রড ব্যবসায়ী অনিক হাসান বলেন, আগে চট্টগ্রাম থেকে এক ট্রাক রড আনতে ২২ হাজার টাকা ভাড়া লাগত; এখন তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার টাকা। ঢাকা থেকে রড আনতে ট্রাক ভাড়া ১৩ হাজার থেকে বেড়ে ১৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঢেউটিন ব্যবসায়ীরাও প্রতি টিনে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন।
পরিবহন সংকটে কৃষকরা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সবজি ব্যবসায়ীরা। বগুড়ার সবচেয়ে বড় সবজির হাট মহাস্থান থেকে সবজি যায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। ঢাকায় প্রতি ট্রাক সবজির ভাড়া ছিল ১৪ হাজার টাকা; এখন নিচ্ছে ১৮ হাজার টাকা। মহাস্থান মুক্তি ফলভান্ডারের মালিক রহেদুল ইসলাম বলেন, পটুয়াখালী থেকে এক সপ্তাহ আগে এক ট্রাক তরমুজ এনেছিলাম ২৮ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে। এখন ভাড়া সাত হাজার টাকা বেড়েছে। এতে তরমুজ বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে বিক্রি করেছি ৫০ টাকা কেজি; এখন বিক্রি করছি ৫৫ টাকা কেজিতে। শেরপুরের সাহা চালকলের মালিক প্রদীপ সাহা বলেন, এক সপ্তাহ আগে হবিগঞ্জে চাল পাঠিয়েছি ১৮ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়ায়; এখন ট্রাক ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার টাকা। ট্রাক ভাড়া বাড়ার কারণে চালের দামও কিছুটা বেড়েছে। ২৫ কেজির কাটারি চাল আগে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকায়; এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। শহরের রাজাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, জয়পুরহাটের হিলি থেকে মালামাল আনতে টনপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা বেড়েছে। আগে ছিল ৬৫০ টাকা; এখন ৭৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। শহরতলির ভবের বাজার এলাকার ট্রাকচালক সাজু মিয়া বলেন, তেল সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়া বাড়াতে হয়েছে। পাম্পে পাম্পে ঘুরেও চাহিদা অনুযায়ী তেল সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। বগুড়া জেলা ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিন্টু খান বলেন, তেল সংকটের কারণে অনেকে ট্রাক পড়ে আছে। এতে ঈদ সামনে রেখে পণ্য পরিবহন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আগের চেয়ে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিয়েও আড়তদাররা পণ্য পরিবহনের ট্রাক পাচ্ছেন না। নিমসার কাঁচাবাজারে দিনাজপুর থেকে ট্রাকে আলু নিয়ে আসা চালক আমজাদ আলী বলেন, আগে ট্রাক ভাড়া ২৫-২৬ হাজার থাকলেও এখন ৩৩-৩৪ হাজার টাকা লাগছে। তিনি জানান, ট্রাক ছাড়ার পর পাঁচ-ছয়টি পাম্প ঘুরে জ্বালানি নিতে হয়েছে। ঠাকুরগাঁও থেকে আসা ট্রাকচালক রমিজ উদ্দিন বলেন, আগে ট্রাক ভাড়া ২৯ হাজার থাকলেও এখন মালিক নিচ্ছেন ৩৪ হাজার টাকা।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সংকটের শঙ্কায় অনেক ট্রাকচালক ও মালিক আগেভাগেই তেল নেওয়ার জন্য ফিলিং স্টেশনে ভিড় করছেন। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। বেড়েছে ভাড়া। যেখানে নওগাঁ থেকে ঢাকায় একটি ট্রাক ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা; এখন সেখানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া দাবি করছেন চালকরা। নওগাঁ শহরের ট্রাক টার্মিনালে চালক দুলাল হোসেন বলেন, আমার দরকার ৩০ লিটার; দেওয়া হচ্ছে পাঁচ লিটার তেল। এই তেলে বগুড়া যাওয়া যাবে না, ঢাকা যাব কীভাবে? এসব কারণে বুকিং করা অনেক ট্রিপ বাতিল করতে হয়েছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জ্বালানি তেল সরবরাহ কম থাকায় কাঁচামাল পরিবহন ও সাধারণ যানবাহন চলাচলে প্রভাব পড়েছে। শিল্পকারখানা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি ও অন্যান্য কাঁচামাল সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। শহরের বড় বাজারের কাঁচামাল সমিতির সভাপতি রওশান আলী বলেন, জ্বালানি তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে। জেলা ট্রাক ও শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আমিনুর রহমান বলেন, প্রতিটি পাম্পে গাড়িপ্রতি ১০০-১২০ লিটার তেল দিচ্ছে, যা চাহিদার চেয়ে অনেক কম। এতে দূরপাল্লার গাড়িগুলো যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
যশোর অফিস জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন জেলার ২২টি রুটের যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু বাস বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে; আবার কোনোটি বন্ধ রয়েছে। যশোর পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোর্তজা বলেন, কোথাও তেল পাচ্ছি, কোথাও পাচ্ছি না। বিভিন্ন রুটে বাস পরিবহন সীমিত হয়ে গেছে।
Posted ১২:৫৮ পিএম | মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।